শাহ্ জামাল :
কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার দফাদার পেট্রোল পাম্পে বিস্ফোরনের ঘটনায় নিহত বিদ্যুৎ’র পরিবারের কান্না থামছেই না। ছেলে হারানোর শোকে বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন মমতাময়ী মা এবং বাবা। সদ্য বিবাহিত স্ত্রীও জ্ঞান শূন্য হয়ে মৃত্যু পথযাত্রী। শোকে মুহমান হয়ে পড়েছে পুরো হোসেনপুর গ্রাম। বুধবার দিবাগত রাতে ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিদ্যুৎ মারা গেলে বুধবারই তার মরদেহ গ্রামের বাড়িতে আনা হলে শোকের ছায়া নেমে আসে। রাত সাড়ে ১১টায় তার দাফন সর্ম্পন্ন হয়। অন্যদিকে গত ১২ অগাষ্ট থেকে ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৭ দিন অতিবাহিত হলেও ভেড়ামারা থানায় কোন মামলা হয়নি।
জুনিয়াদহ ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামের চরম হতদরিদ্র দিনমজুর বিল্লাল হোসেনের পুত্র বিদ্যুৎ (২৫)। সুদর্শন এবং মেধাবী হওয়ার কারনে এলাকায় তার সুনাম ছিল। দুই ভাইয়ের মধ্যে বিদ্যুৎ ছোট। ১ বছর আগে লেখাপড়ার পাশাপাশি চাকরী নিয়েছিলেন ভেড়ামারা-আল্লারদর্গা সড়কের পাশে মৈসাস দফাদার ফিলিং ষ্টেশনে। গত ১২ আগস্ট সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ফিলিং স্টেশনে বিস্ফোরনের ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই দৌলতপুর উপজেলার দিঘলকান্দি গ্রামের শাহাজুদ্দীনের ছেলে শাহাজুল (৩৫) ও একই এলাকার তৌহিদুল ইসলামের ছেলে বিজয় (১৬) নিহত হয়। পরদিন ১৩ আগষ্ট দিবাগত রাত ১২টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ফিলিং স্টেশনের শ্রমিক মো. রাজিব উদ্দিন (২৫) ও ১৮ আগস্ট ভোরে রিমন (১৪) মারা যান। তারা রাজধানীর শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছিলেন। আর শরীরের ১৭ শতাংশ পুড়ে যাওয়া শরীর নিয়ে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছিলেন ভেড়ামারা উপজেলার জুনিয়াদহ ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামের বিদ্যুৎ হোসেন। সেও গত মঙ্গলবার রাত ১২টা ৫ মিনিটে ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। বুধবারই তার মরদেহ আনা হয় গ্রামের বাড়ি হোসেনপুরে। এসময় পুরো এলাকাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে।
নিহত বিদ্যুৎ’র চাচাত বোন, পরানখালি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নির্বাচিত অভিভাবক প্রতিনিধি মমতাজ খাতুন জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ এবং তার বড় ভাইকে নিয়েই ছিল তার দিনমজুর বাবা বিল্লালের সংসার। অনেক কষ্ট করে দুই ভাই কে লেখাপড়া করিয়ে সবে মাত্রই আয় রোজগারের পথে নেমেছিল তারা। আধাপাকা ঘরের কাজ শুরু করেছিল। বড় ভাই রুপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে শ্রমিকের কাজ করে। আর বিদ্যুৎ লেখাপড়ার পাশাপাশি ১ বছর আগে চাকুরী নিয়েছিলেন দফাদার ফিলিং ষ্টেশনে। বিদ্যুৎ’র মৃত্যুর মধ্য দিয়ে পুরো পরিবারের স্বপ্নসাধ ধুলায় মিসে গেছে। তিনি জনান, প্রায় ৭ মাস আগে বিবাহিত জীবন শুরু করেছিল বিদ্যুৎ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অগিদগ্ধ হওয়ার পরই তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানীর শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। পরিবারের পাশাপাশি পাম্প কর্তৃপক্ষও চিকিৎসার অর্থ জুগিয়েছে। এছাড়াও ভেড়ামারা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপজেলা নির্বাহী অফিসার দীনেশ সরকার ১০ হাজার টাকার অর্থ সহায়তা দিয়েছিলেন। কয়েক দিন আগে অগাষ্ট মাসের বেতন হিসাবে ১০ হাজার টাকা দিয়েছে দফাদার ফিলিং ষ্টেশন কর্তৃপক্ষ। এছাড়াও বড় ধরনের কোন আর্থিক সহযোগিতা তারা এখনো দেয়নি পরিবার কে। সূত্র জানিয়েছে, বিদ্যুতের শেষ কাজ হিসাবে মিলাদ মাহফিল করার জন্য ফিলিং ষ্টেশন কর্তৃপক্ষ মাত্র ৫ হাজার টাকা দিয়েছে।
একটি অসমর্থিত সূত্র জানিয়েছে, দফাদার ফিলিং স্টেশন এ দূর্ঘটনার ঘটনায় এ পর্যন্ত ৫ জন নিহত হয়েছে। এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোন মামলা হয়নি। ভেড়ামারা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের স্টেশন অফিসার শরিফুল ইসলাম তৎকালীন সময় জানিয়েছিলেন, দফাদার ফিলিং ষ্টেশনে প্রচুর অসংগতি ছিল। যার কারনেই বিস্ফোরনের ঘটনা ঘটে। খুব সংরক্ষিত এলাকায় তেলের ট্যাংকি বিস্ফোরন ঘটে। ওখানে বাহিরের কোন লোকের যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। তারপরো বাহিরের দুজন লোক সেখানে গিয়ে বিস্ফোরনের শিকার হয়ে অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহত হন। আরো ৩ জন অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে হেরে গেছেন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল, সাধারণত পাম্পের ট্যাংক এলাকার বাতাসে তেল ভাসতে থাকে। ওই ট্যাংকের ওপর দিয়ে বিদ্যুতের বেশ কয়েকটি তার আছে। কোনো কারণে বিদ্যুতের তারে স্ফুলিঙ্গ হলে বাতাসে থাকা তেলের সংস্পর্শে এসে আগুন ধরে যায়। এতে খুব কাছে থাকা ব্যক্তিরা দগ্ধ হন। ঘটনাস্থলে বিদ্যুতের খুঁটির দুটি তার পড়ে থাকতে দেখা যায়।
এই কর্মকর্তা বলেন, ট্যাংক এলাকায় বাইরের সাধারণ লোক যাওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তাঁরা কীভাবে গেলেন, সেটা ফিলিং স্টেশনের লোকজন ভালো বলতে পারবেন। আর ট্যাংকের ওপর দিয়ে বিদ্যুতের তার থাকার কথা না। কিন্তু সেখানে তার ছিল। সব মিলিয়ে বেশ কিছু অসংগতি চোখে পড়েছে। কিন্তু বিস্ফোরনের পর পাম্পের মালিক পক্ষের কোন লোককে পাওয়া যায়নি।
ভেড়ামারা থানার অফিসার ইনচার্জ মজিবুর রহমান জানিয়েছেন, দফাদার ফিলিং ষ্টেশনে বিস্ফোরনের ঘটনায় ঘটনাস্থলে ২ জন এবং পরে আরো ৩ জন নিহত হলেও কোন মামলা হয়নি। নিহত’র পরিবার বা স্বজনরা কেউ কোন অভিযোগ দাখিল করেনি। তবে এ বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে।