মাহামুদা আশরাফি তামান্না :
বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, সাংবাদিকতার পথিকৃৎ এবং সমাজ সংস্কারক কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের স্মৃতিধন্য বসতভিটা আজ চরম অবহেলা ও অযতেœ ধুঁকছে। কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহের কাঙাল কুটিরের বর্তমান জরাজীর্ণ অবস্থা দেখে যে কারো মন বিষাদে ভরে উঠবে। এই বাড়িটি শুধু একজন ব্যক্তির স্মৃতিচিহ্ন নয়, এটি বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং মুক্তচিন্তার ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বহন করে চলেছে। অথচ কালের করাল গ্রাসে এর ঐতিহ্য আজ বিলুপ্তির পথে।
কাঙাল হরিনাথ মজুমদার (১৮৩৩-১৯২৫) ছিলেন একাধুনা সাহিত্যের বহুধা প্রতিভার অধিকারী। তিনি একাধারে ছিলেন কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সমাজসেবক এবং বাউল সাধক। তাঁর সম্পাদিত ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকাটি ছিল সেকালের এক দুঃসাহসী পদক্ষেপ, যা গ্রামীণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করেছে। এই পত্রিকায় প্রকাশিত খবর ও প্রবন্ধগুলো জমিদারদের অত্যাচার এবং নীলকরদের শোষণ-বঞ্চনার চিত্র তুলে ধরেছিল, যা তৎকালীন সমাজে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
কাঙাল হরিনাথ মজুমদার শুধু সাংবাদিকতা করেই ক্ষান্ত হননি, তিনি তাঁর বাড়িতেই স্থাপন করেছিলেন একটি ছাপাখানা– “এম.এন. প্রেস”। শৈশবকালে মারা যাওয়া প্রিয় বন্ধু মথুরানাথ-এর নামে কাঙাল হরিনাথ এ নামকরণ করেছিলেন। এই ছাপাখানা থেকে ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ নিয়মিত প্রকাশিত হতো। এটি ছিল গ্রামীণ জনপদে শিক্ষার আলো ছড়ানো এবং মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছে দেওয়ার এক বিপ্লবী মাধ্যম। যখন সংবাদপত্র ও ছাপাখানার ধারণা সাধারণ মানুষের কাছে সুদূর পরাহত ছিল, তখন হরিনাথ মজুমদারের এই উদ্যোগ ছিল নিঃসন্দেহে এক ব্যতিক্রমী ও সাহসী পদক্ষেপ। এই ছাপাখানা শুধু খবর ছাপাতো না, এটি ছিল মুক্তচিন্তার এক কেন্দ্র। যা জ্ঞানচর্চায় অনবদ্য ভূমিকা রেখেছিল।
কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের বাড়িটি ছিল তৎকালীন সাহিত্য ও সংস্কৃতির পীঠস্থান। তাঁর সঙ্গে অনেক কিংবদন্তী ব্যক্তিত্বের নিবিড় সম্পর্ক ছিল। বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ ছিলেন কাঙাল হরিনাথের পরম বন্ধু ও আধ্যাত্মিক গুরু। লালনের অনেক গান প্রথম কাঙাল হরিনাথের ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয়েছিল। হরিনাথ মজুমদারই প্রথম লালনকে জনসমক্ষে নিয়ে আসেন এবং তাঁর গান ও দর্শনের প্রচার ও প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। লালনের আঁখড়ায় হরিনাথের নিয়মিত যাতায়াত ছিল এবং তাঁদের মধ্যে গভীর আত্মিক সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলাইদহে তাঁর পৈত্রিক জমিদারীতে অবস্থানকালে প্রায়শই কাঙাল হরিনাথের সাথে দেখা করতেন। রবীন্দ্রনাথের সাথে তাঁর সাহিত্য ও সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হতো। রবীন্দ্রনাথের অনেক সাহিত্যকর্মের অনুপ্রেরণা এবং তার উপর হরিনাথের প্রভাবও লক্ষ্যণীয়। রবীন্দ্রনাথ হরিনাথকে ‘কাঙাল’ উপাধি দিয়েছিলেন, যা পরে তার নামের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ তার বিখ্যাত ‘ছিন্নপত্রাবলী’-তে একাধিকবার কাঙাল হরিনাথ এবং তার “গ্রামবার্তা প্রকাশিকা” সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন, যা তাদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সখ্যতার প্রমাণ।
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেনের সাথেও কাঙাল হরিনাথের সখ্যতা ছিল। মীর মশাররফ হোসেনের সাহিত্য কর্মে হরিনাথের প্রভাব সুস্পষ্ট ছিল। তাঁদের পারস্পরিক আলোচনা ও মতবিনিময় বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। ‘বিষাদসিন্ধু’ প্রথম এখানে প্রকাশিত হয়।
দুঃখজনক হলেও সত্যি, বাংলা সাহিত্যের এত বড় এক স্তম্ভের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। বসতভিটার বেশিরভাগ অংশই ভেঙে পড়েছে। দেয়ালগুলো ফাটল ধরেছে, ছাদ ধসে পড়ার উপক্রম। যে ছাপাখানা একসময় জ্ঞান ও মুক্তচিন্তার আলো ছড়িয়েছিল, তার চিহ্ন পর্যন্ত নেই। অযতœ আর অবহেলার কারণে বাড়ীর মূল্যবান আসবাবপত্র, দলিলপত্র এবং অন্যান্য স্মৃতিচিহ্ন প্রায় বিলুপ্ত। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এ বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই।
ইতিহাস আর ঐতিহ্যের ধারক এই বাড়িটি যদি দ্রুত সংরক্ষণ করা না হয়, তাহলে কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে এক অমূল্য ইতিহাস। এখনই সময়, কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের বসতভিটা সংরক্ষণে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ গ্রহণ করা। এই বাড়িটি পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বাংলা সাহিত্যের এই মহানায়কের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে জানতে পারবে এবং তাঁর অবদানকে স্মরণ করতে পারবে। অন্যথায়, এই অবহেলা আমাদের জাতিগত পরিচয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশকে অন্ধকারে ঠেলে দেবে।