আখেরাত হোসেন, ষ্টাফ রির্পোটার :
কুষ্টিয়া শহরের পূর্ব মজমপুর এলাকার উদয় মা ও শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র। অভাবি, অসহায়-দুস্থ ও স্বামী-সন্তানহারা বৃদ্ধ মায়েদের জন্য ১৯৯৯ সালে এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা হয়। বর্তমানে সেখানে আমেনা বেগমের মতো জীবনের পড়ন্ত বেলায় অসহায় বৃদ্ধা ২৭ জন মা থাকেন। এসব অসহায় মায়েদের খাবার, চিকিৎসাসেবা, ওষুধ, পোশাক-পরিচ্ছদসহ নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করে পুনর্বাসন কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ। তবে আর্থিক অভাবের কারণে প্রয়োজনীয় খাবার, পোশাকসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার যথাযথ ব্যবস্থা করতে পারে না তারা। পবিত্র মাহে রমজানের রোজায় তীব্র খাবার সংকটে ভুগছেন বৃদ্ধাশ্রমের ২৭ বৃদ্ধা মা। এমন সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর অনেক বৃত্তবানরা এগিয়ে এসে সাহায্যে সহযোগিতা করছেন। কিন্তু তাদের প্রয়োজন স্থায়ী সমাধান। এজন্য প্রয়োজন সরকারী বা বেসরকারী টেকসই সহযোহিতা।
গত বুধবার ইফতারের ১৫ মিনিট আগে সরজমিনে উদয় মা ও শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, বয়স্ক মায়েরা কেউ অজু করছেন, কেউবা বসে দোয়া-দরুদ পড়ছেন। কেউ ঘুমাচ্ছেন, কেউবা নামাজ পড়ছেন। কেউবা চুপচাপ ইফতার করার জন্য বসে আছেন। সবার চোখেমুখে কষ্টের ছাপ। রোজাদার বৃদ্ধা অসহায় মায়েদের জন্য থালায় ভাত তুলে দেওয়া হচ্ছে। মসজিদের মাইকে ইফতারের ঘোষণার সাথে সাথে চিনির শরবত দিয়ে ইফতার শুরু করেন। এরপর ভাত খাওয়া শুরু করেন তারা। অর্থের অভাবে ইফতার সামগ্রী কিনতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। এজন্য ভাত দিয়ে একবারে রাতের খাবার ও ইফতার সম্পন্ন করেন বলে জানিয়েছেন ভাগ্যতাড়িত অসহায় মায়েরা ও কর্তৃপক্ষ।
বৃদ্ধা আমেনা বেগম। কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বটতৈল এলাকায় বাড়ি। জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে তার ঠাঁই হয়েছে মা ও শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র নামের বৃদ্ধাশ্রমে। তিনি বলেন, আমার জীবন খুব কষ্টের। আমি বাসাবাড়ি ও রাস্তার কাজ করে ছেলে-মেয়েকে মানুষ করেছি। আমার ছেলে-মেয়ে, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন সবাই আছে। কেউ আমাকে দেখাশোনা করে না। আগে লোকের বাড়ি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতাম। কিন্তু আমি এখন বৃদ্ধা হয়ে গেছি, কাজ করতে পারি না। গত ৫ বছর ধরেই আমার ঠিকানা এই বৃদ্ধাশ্রম। বৃদ্ধাশ্রমের জীবনও অনেক কষ্টের। টাকা পয়সার অভাবে ইফতারের জিনিসপত্র কিনতে পারে না। অনেক সময় খাবারও কিনতে পারে না। ঘরের টিন ফুটো হয়ে গেছে। বৃষ্টি হলে ঘরের মধ্যে পানি চলে আসে। আমাদের কাপড়, ওষুধ, ইফতারের কষ্ট। সবকিছুরই কষ্ট। আমরা চলতে পারছি না। ভাত দিয়ে ইফতার করতে হচ্ছে। কাঁদতে কাঁদতে এভাবেই্ বলছিলেন বৃদ্ধা আমেনা খাতুন। ষাটোর্ধ্ব বয়সী সাজেদা খাতুন বলেন, ছেলে-মেয়ে আছে। তাদেরকে কষ্ট করে কোলেপিঠে করে মানুষ করেছি। এখন তারা, যার যার মতো। যার যার কর্ম সে সে করছে। তারা তাদের ছেলেপিলে নিয়ে করে খাচ্ছে। আমি এখন বুড়োকালে বৃদ্ধাশ্রমে থাকি। আমাদের জীবনটা অনেক কষ্টের জীবন। ছেলে-মেয়ে থেকেও নেই। আগেকার জীবনের কথা বলতে গেলে কষ্ট বেড়ে যায়। সেসব কথা বলতে চাই না।
আনজিরা খাতুন বলেন, আমার ছেলে-মেয়ে আছে, তারা দেখাশোনা করে না। আমি ৫ বছর ধরে বৃদ্ধাশ্রমে আছি। আমি অনেক আগে থেকে অসুস্থ। হার্টের অসুখ, টাকার জন্য চিকিৎসা করাতে পারি না। এমন সংবাদ পত্রিকায় এবং ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে অনেক বৃত্তবানই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। ফলে মাহে রমজানে মায়েরা একটু ইফতারী করতে পারলেও তাদের জন্য প্রয়োজন স্থায়ী সমাধান। ভুক্তভোগীরা প্রশাসনের এবং বৃত্তবানদের এগিয়ে আসার দাবী জানিয়েছেন।