শাহ্ জামাল :
নেই কোন ভবন, নেই আধুনিক কোন সুযোগ সুবিধা। একটি শোচাগার ভাগাভাগি করেই ব্যবহার করেন ১৩ শিক্ষক এবং ২১২ জন শিক্ষার্থীরা। নেই শিক্ষার্থীদের জন্য কমন রুম, লাইব্রেরী, আইসিটি ল্যাব, মাল্টিমিডিয়া ক্লাশ রুম, বিজ্ঞানাগার। নেই শিক্ষকদের জন্য আলাদা কোন রুম, অফিস সহকারীর রুম, শোচাগার, ক্লাশ রুম। শুধু নেই আর নেই। এমন একটি অনুন্নত, ভাঙ্গা চোরা, পিছিয়ে পড়া ভেড়ামারার ফয়জুল্লাহপুর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের দায়িত্ব নিলেন ভেড়ামারা উপজেলা পরিষদের নব-নির্বাচিত চেয়ারম্যান আবু হেনা মোস্তফা কামাল মুকুল। তিনি চান, শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এনে এই পিছিয়ে পড়া বিদ্যালয়টিকে যুগোপযোগী এবং আধুনিক মানের শিক্ষা ব্যবস্থা হিসাবে গড়ে তুলতে।
নদী বিধৌত, অবহেলিত একটি গ্রাম জুনিয়াদহ ইউনিয়নের ফয়জুল্লাহপুর। শিক্ষা সহ নানা দিক দিয়েই পিছিয়ে অনুন্নত এই এলাকা। কুসংস্কার দূর করে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে এলাকার শিক্ষিত যুবক এস এম বেনজির আহমেদ ১৯৯৮ সালে গড়ে তোলেন ফয়জুল্লাহপুর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়। নানা চড়াই উৎরায় পার করে এগিয়ে নেন এর শিক্ষাকার্যক্রম। এলাকাবাসীর সহযোগিতায় এবং শিক্ষকদের আর্থিক অনুদানে টিনসেড ঘর নির্মান করে শুরু হয় লেখাপড়া। যা আজো চলমান। দীর্ঘদিন হাজারো চেষ্টা তদবির করেও বিদ্যালয়টি এমপিও ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। ২০২২ সালের জুন মাসে বিদ্যালয়টি এমপিও ভুক্ত করা হয়।
ভেড়ামারা শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে ভেড়ামারা-রায়টা প্রধান সড়কের রায়টা সেন্টারের পাশেই ফয়জুল্লাহপুর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়। সরজমিন বিদ্যালয় গিয়ে দেখা যায়, অর্ধেক বাউন্ডারী ওয়াল দিয়ে ঘিরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে বালিকা বিদ্যালয়টি। ফাঁকা মাঠ’র এক প্রান্তে মাটির একটি মঞ্চ। দুই প্রান্তে অধিক পুরানো ২টি পৃথক টিন সেড আধাপাকা ঘর। বিদ্যালয়ের সীমানা জুড়ে এক ব্যাক্তি এমন ভাবে ঘর নির্মান করেছেন, যা দেখে মনে হয় ওই ঘরটিও বিদ্যালয়ের। যা বিদ্যালয়ের সৌন্দয্যে নষ্ট করেছে। প্রধান শিক্ষকের সাথে কথা বলে জানা গেছে, হাজারো সমস্যার আবর্তে ঘূর্নি পাক খাচ্ছে বিদ্যালয়টি। বিদ্যালয়ে শুধু নেই আর নেই। বর্তমানে ২১২ জন ছাত্রী রয়েছে এই বিদ্যালয়ে। ৯ জন শিক্ষক। চতুর্থ শ্রেনীর কর্মকর্তা কর্মচারী ৪ জন। ৭৬ শতক জমির উপর প্রতিষ্ঠিত স্কুলে রয়েছে ৭ টি রুম বিশিষ্ট ২টি টিন সেড ঘর। ৬ষ্ট থেকে ১০ম শ্রেনীর শিক্ষার্থীদের ৫টি শ্রেনীর জন্য রয়েছে ৫টি ক্লাস রুম। ১টি প্রধান শিক্ষক এবং অফিস সহকারী ব্যবহার করেন। অন্যটি সকল শিক্ষক, লাইব্রেরী সহ সকল কাজে ব্যবহৃত হয়। ৫টি শ্রেনীর জন্য ৫টি ক্লাস রুমে গাদাগদি করে পাঠদান চলে শিক্ষার্থীদের। রুমে ১টি মাত্র ফ্যান। প্রচন্ড গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা ছাত্রীদের। শিক্ষকদের জন্য নেই আলাদা কোন শোচাগার। ১টি মাত্র শোচাগার দিয়েই বিদ্যালয়ের ২১২ জন ছাত্রী এবং ১৩ জন শিক্ষক কর্মচারীর প্রাকৃতিক কার্যসম্পাদন করতে বাধ্য হচ্ছে। অত্যান্ত মানবেতর আর রুগ্ন পরিবেশে চলছে পাঠদান।
ফয়জুল্লাহপুর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এস এম বেনজির আহমেদ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ২৪ বছর নানা চেষ্টা তদবির করার পর ২০২২ সালের জুনে বিদ্যালয়টি এমপিও ভুক্ত হয়েছে। ২০১০ সাল থেকে স্কুলের নামেই শিক্ষার্থীরা জেএসসি, এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। কিন্তু এমপিও ভুক্ত না হওয়ায় উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয় স্কুলটি। বর্তমানে লেখাপড়ার মানবৃদ্ধি সহ ছাত্রী উপস্থিতির হার অনেক সন্তোষজনক। তিনি বলেন, একটি ভবনের অভাবে সব দিক থেকেই পিছিয়ে পড়েছে বিদ্যালয়টি। ৪ তলা বিশিষ্ট ভবন নির্মান হলেই বিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত হবে শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব, মাল্টিমিডিয়া ক্লাশ রুম, আইসিটি ল্যাব, বিজ্ঞানাগার. ছাত্রীদের জন্য আলাদা কমন রুম, লাইব্রেরী। ক্লাশ রুমের সংকট ভয়াবহ। গাদাগাদি করে ছাত্রীদের ক্লাশে বসতে হয়। মাত্র ১টি ফ্যান রয়েছে ক্লাশে। প্রচন্ড গরমে নাভিশ^াস অবস্থা হয় ছাত্রীদের। ১টি মাত্র শোচাগার। অত্যান্ত রুগ্ন পরিবেশ। যা খুবই কষ্টদায়ক। তিনি আশা করেন, একটি ভবন নির্মান হলেই বিদ্যালয়টি নারী শিক্ষার অগ্রযাত্রায় ভূয়সী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। শিক্ষার মান বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বৃদ্ধি পাবে বহুগুনে। কারন অত্রাঞ্চলে নেই নারী শিক্ষার কোন বিদ্যালয়।
ভেড়ামারার বহু শিক্ষা প্রতিষ্টানের মধ্যে কেন অজোপাড়া গাঁয়ের পিছিয়ে পড়া ফয়জুল্লাহপুর বালিকা বিদ্যালয়ের দায়িত্ব নিলেন, এমন এক প্রশ্নের জবাবে ভেড়ামারা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবু হেনা মোস্তফা কামাল মুকুল বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলে সকল সেক্টরেই বহু উন্নয়ন হয়েছে। নারী শিক্ষার মান বৃদ্ধি এবং অগ্রগতি হয়েছে চোখে পড়ার মত। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, ফয়জুল্লাহপুর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় বহু পিছিয়ে পড়েছে। নারী শিক্ষার কোন প্রসার ঘটেনি। বিদ্যালয়ে শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব সহ কোন কিছুই নেই। ২৬ বছরের পুরোনা প্রতিষ্টান হলেও বিদ্যালয়ে কোন উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। আমি কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের সদস্য থাকাকালীন সময়ে ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে জেলা পরিষদের বাজেট থেকে দেড় লক্ষ টাকা বরাদ্ধ দিয়েছিলাম। সেই সময় শতভাগ টাকার উন্নয়ন করেছিলো প্রতিষ্ঠানটি। আমি দায়িত্ব নিয়ে, পিছিয়ে পড়া এই বিদ্যালয় টিকে সমযোপযোগী এবং আধুনিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে তুলতে চাই। বর্তমান সরকারের মহত উদ্দোগ নারী শিক্ষার অগ্রযাত্রায় ভূমিকা রাখতে চাই।