শাহ্ জামাল :
৩দিন নিখোঁজ থাকার পর ফ্রিলান্সার যুবক মিলনের টুকরো টুকরো লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহতের স্ত্রীর জিডির সূত্র ধরে একটা একটা আসামী আটকের পর লাশ পর্যন্ত পোঁছায় পুলিশের চৌকষ দলটি। লোমহর্ষক এই হত্যাকান্ডে হৃদয় কেঁপে উঠে কুষ্টিয়াবাসীর। হত্যাকান্ডে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে ইতোমধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রলীগের বহিস্কৃত সহ-সভাপতি সজীব শেখ সহ ৬ জন কে। সজিব কিশোর গ্যাং বিএসবি গ্রুপের প্রধান।
গত শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে লাশ উদ্ধারে অভিযান শুরু করে পুলিশ। শনিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত পদ্মার চর থেকে মিলনের লাশের ৯ টুকরা উদ্ধার করে। সে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার বাহিরমাদি গ্রামের মাওলা বক্স সরদারের ছেলে। স্ত্রী মুমো খাতুনকে নিয়ে তিনি কুষ্টিয়া শহরের হাউজিং এলাকার ই-ব্লকে ভাড়া থাকতেন।
টেক্সটাইল প্রকৌশলে পড়াশোনার পাশাপাশি অনলাইনে আউটসোর্সিংয়ের কাজ করতেন মিলন। বুধবার সকালে এস কে সজীব নামের এক যুবকের ফোনে তিনি বাসা থেকে বের হয়ে আর ফেরেননি। ওই দিন সন্ধ্যায় মিলনের স্ত্রী মুমো থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। জিডির সূত্র ধরেই মাঠে নামে পুলিশ।
মুঠোফোনের একটি কল লিস্টের সূত্র ধরে প্রথমে মিলনের এক বন্ধুকে আটক করা হয়। তার স্বীকারোক্তিতে জানা যায়, আরেকবন্ধু সজিবের নেতৃত্বে মিলনকে হত্যা করা হয়েছে। পরবর্তীতে শুক্রবার বিকেলে অভিযান চালিয়ে সজিবসহ আরো চারজনকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তারা মিলনকে হত্যা করে তার লাশ টুকরো টুকরো করে নদীর চরে পুতে রাখার বিষয়টি স্বীকার করে। এরপর শুক্রবার দিবাগত রাত ২টার দিকে তাদেরকে নিয়ে হাটশ
হরিপুর ইউনিয়নের কান্তিগর বোয়ালদহ পদ্মা নদীর চরে অভিযানে যায় পুলিশ। রাতভর অভিযান চালিয়ে নদীর
চরের ৬টি স্থান থেকে মিলনের খন্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়। এছাড়া হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র বাঁধ বাজার এলাকা থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, টাকার দাবিতে মিলনকে হত্যা করা হয়েছে। জড়িতরা সবাই একে অপরের পরিচিত। নিখোঁজের দিন তাকে মুঠোফোনে ডেকে হাউজিং এলাকার একটি বাড়িতে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। ঐদিন রাতেই তাকে হত্যা করা হয়।
যেভাবে মিলনকে হত্যা ঃ
থানায় জিডির পর থেকে লাশ উদ্ধার ও জড়িতদের ধরার অভিযানে নেতৃত্ব দেন কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস ও মিডিয়া) পলাশ কান্তি নাথ। পুলিশের এই কর্মকর্তাসহ আরও ২-৩ জন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে ঘটনার বিস্তারিত জানা যায়। গ্রেপ্তার আসামিদের স্বীকারোক্তির বরাত দিয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ফোন করে মিলনকে অফিসে ডেকে নেন তাঁর ব্যবসায়িক অংশীদার সজল। সেখানে আগে থেকে সজীবসহ কয়েকজন অবস্থান নিয়েছিলেন। অফিসে যাওয়ার পর মিলনের কাছে চাঁদা দাবি করেন সজীব। ভয়ভীতি দেখাতে তাঁকে মারধর করেন। একপর্যায়ে মুখে গামছা গুঁজে নাক চেপে ধরেন। ঘটনাচক্রে মিলন মারা যান।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, মিলনকে হত্যার সময় ওই অফিসের দুটি কক্ষে সজীবসহ অন্তত ১০ থেকে ১১ জন ছিলেন। সেখানে দুটি কক্ষে তাঁরা অবস্থান নেন। লাশ গুম করতে সজীব পরিকল্পনার কথা জানান তাঁদের। এ সময় একজনকে সঙ্গে নিয়ে অফিসে তালা লাগিয়ে বাইরে চলে যান। বাকিরা ঘরের ভেতর থাকেন। দেড় ঘণ্টা ধরে শহরের তিনটি দোকান থেকে লাশ কাটার জন্য হেক্সা ব্লেড, পলিথিন ব্যাগ ও রক্ত পরিষ্কারের জন্য জীবাণুনাশক কেনেন। বিকেল পাঁচটার দিকে আবার অফিসে ফিরে আসেন। পরে দুর্বলচিত্তের ৪-৫ জনকে পাশের কক্ষে রাখেন। সজীবসহ ৪-৫ জন মিলে একটি কক্ষের বাথরুমে লাশ নিয়ে টুকরা করেন। প্রায় ৪ ঘণ্টা ধরে লাশ কেটে তাঁরা ব্যাগে ভরেন।
পুলিশ জানায়, রাত সাড়ে নয়টার দিকে তাঁরা চারটি মোটরসাইকেলে সাতজন ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে আসেন। বাকিদের সজীব যে যার মতো বাড়ি চলে যেতে বলেন এবং বিষয়টি কাউকে না জানাতে হুমকি দেন। পুলিশ শহরের কয়েকটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। তাতে দেখা গেছে, রাত ৯টা ৩২ মিনিটের দিকে চারটি মোটরসাইকেলে সাতজন শহরের ছয়রাস্তা মোড় হয়ে হরিপুর সেতু দিয়ে পদ্মার চরের দিকে চলে যান। রাত ১১টার মধ্যে লাশের টুকরাগুলো পদ্মার চরে বালুচাপা দিয়ে যে যাঁর মতো বাড়ি চলে আসেন। সবাই স্বাভাবিকভাবে শহরে চলাফেলা করতে থাকেন। কেউ পালানোর চেষ্টা করেননি।
যেভাবে জড়িতদের আটক করা হয় ঃ
জিডির সূত্র ধরে সজলকে থানায় ডেকে নেয় পুলিশ। এরপর তাঁকে উপর্যুপরি জিজ্ঞাসাবাদ চলে। কিন্তু বৃহস্পতিবার সারা দিনেও তিনি কোনো তথ্য দেননি। শুক্রবার সকালে সজল থানায় তাঁর এক পরিচিত পুলিশ সদস্যকে মিলনকে হত্যার কথা জানান। এরপর বিষয়টি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানতে পারেন। পরে অভিযান চালিয়ে চার ঘণ্টার মধ্যে সজীবসহ আরও চারজনকে শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ। সজীবকে আটকের পর তাঁর ফোনে বিভিন্ন সময়ে কয়েকজন নেতা ফোন করেন। তখন ফোনটি পুলিশের হেফাজতে ছিল।
আটক ব্যক্তিরা মিলনকে হত্যার কথা অস্বীকার করতে থাকেন। শুক্রবার রাতে সজীব কান্না করতে করতে একপর্যায়ে সব ঘটনা পুলিশকে জানান। ভোররাতে লাশের টুকরা উদ্ধারে যান অন্তত ৫০ জন পুলিশ সদস্য। লাশ গুমের পর লাশ টুকরা করতে ব্যবহৃত যন্ত্র বাধবাজার এলাকায় একটি পুকুরে এবং মিলনের ব্যবহৃত মোবাইল জঙ্গলে ফেলে দেন তাঁরা। সেই ফোন এখনো উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পলাশ কান্তি নাথ সাংবাদিকদের বলেন, এ পর্যন্ত ঘটনায় জড়িত ১৩-১৪ জনের নাম পাওয়া গেছে। আরও অধিকতর যাচাই-বাছাই চলছে। সব আসামিকে ধরা হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
সজিব কিশোর গ্যাং বিএসবি গ্রুপের প্রধান ঃ
গ্রেপ্তার হওয়া এসকে সজিব শৃঙ্খলা পরিপন্থি কার্যকলাপে জড়িত থাকার কারণে ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। বর্তমানে তিনি স্বেচ্ছাসেবক লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তিনি কুষ্টিয়া আড়য়াপাড়ার এক সময়ের মাদক ব্যবসায়ী মিলন শেখ ওরফে ডাল মিলনের ছেলে। তার নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরেই কুষ্টিয়া শহরে সক্রিয় রয়েছে বিএসসি গ্রুপ নামের একটি কিশোর গ্যাং। সজিব ওই গ্রুপের প্রধান।
গ্রেপ্তার ৬ আসামী আদালতে ঃ
৩ ফেব্রুয়ারি শনিবার সন্ধ্যায় কুষ্টিয়া মডেল থানায় অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করে মামলা করেন মিলনের মা শেফালী খাতুন। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রোববার বিকেল ৫টায় কুষ্টিয়া আদালতের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদা সুলতানার এজলাসে তাদের হাজির করা হয়। আটককৃতরা হলো ঃ কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি এস কে সজিব, লিংকন, জনি, ইফতি, সজল ও ফয়সাল।