আশিক :
বুড়িগঙ্গার তীরে দাঁড়ালে বাতাস ভারী হয়ে আসে। তাজা জলের স্নিগ্ধ গন্ধ নয়, ভেসে আসে শিল্পবর্জ্য, অপরিশোধিত পয়ঃনিষ্কাশন এবং পচনের এক তীব্র কটু গন্ধ। যে নদীকে একসময় ‘ঢাকার প্রাণ’, ‘ঢাকা শহরের ধমনী’ এবং জীবন্ত যোগাযোগের কেন্দ্র বলা হতো, তা আজ একটি চলমান নর্দমায় পরিণত হয়েছে। নদীর জল এতটাই কালো, ঘন ও তৈলাক্ত যে, সেখানে শৈবালের সবুজ বা ক্ষুদ্রতম জলজ জীবনের কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এই নদীটির পতন কোনো আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফল নয়, বরং এটি আমাদের সম্মিলিত, লাগামহীন উদাসীনতা, স্থানীয় প্রশাসনের দীর্ঘদিনের অবহেলা এবং এক শ্রেণীর প্রভাবশালী মহলের লাগামহীন লোভের ফল।
গত দুই দশকে বুড়িগঙ্গার জলপ্রবাহ, জীববৈচিত্র্য এবং তার ঐতিহাসিক ভূমিকার ওপর একটি গভীর অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই নদীর মৃত্যু ধীরে ধীরে এবং পদ্ধতিগতভাবে ঘটানো হয়েছে। এটি স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ সংস্থা এবং পরিবেশ আদালতের দেওয়া একাধিক নির্দেশনার দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার এক নীরব দলিল। বুড়িগঙ্গার এই করুণ পরিণতি ঢাকার পরিবেশগত ভবিষ্যতের জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা।
ঢাকার ইতিহাস বুড়িগঙ্গা ছাড়া অসম্পূর্ণ। মোগল আমল থেকে ব্রিটিশ শাসন হয়ে আধুনিক ঢাকা পর্যন্ত এই নদীই ছিল ব্যবসা-বাণিজ্য ও যাতায়াতের মূল ভিত্তি। কিন্তু শহরের লাগামহীন বিস্তার, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং অবৈধ দখলদারদের আগ্রাসন নদীটিকে আক্ষরিক অর্থেই শ্বাসরুদ্ধ করে দিয়েছে। ভূমি রেকর্ডে এবং প্রাচীন মানচিত্রে নদীর যে প্রশস্ততা একসময় স্পষ্ট চিহ্নিত ছিল, তার বেশিরভাগই এখন ইট-পাথর, সিমেন্ট আর আবর্জনার স্তূপের দখলে। নদীর উভয় তীরের সীমানা আজ এতটাই সংকুচিত যে, বর্ষার সময়েও তার স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (BIWTA:Bangladesh India Water Transport Authority) এবং ভূমি অফিস থেকে পাওয়া তথ্যমতে, গত ১০ বছরে নদীর দুই তীরের প্রায় কয়েকশো একর সরকারি খাস ভূমি বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের হাতে চলে গেছে। এই দখল প্রক্রিয়াটি বিচ্ছিন্ন বা সাধারণ কোনো ঘটনা নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে।
বাবুবাজার, সদরঘাট, শ্যামপুর, ফতুল্লা এবং কেরানীগঞ্জের কাছে নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা বিশাল বিশাল স্থাপনা, বহুতল ভবন, গুদামঘর এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায়, দখল প্রক্রিয়াটি কতটা সুসংগঠিত এবং ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের ছত্রচ্ছায়ায় সংঘটিত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন স্থানীয় জেলে, যার পরিবার তিন পুরুষ ধরে এই নদীর ওপর নির্ভরশীল, তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “নদীর জায়গা যারা দখল করেছে, তাদের ক্ষমতা অনেক। তারা রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে তাদের বোঝাপড়া আছে। আমরা প্রতিবাদ করলে উল্টো হুমকি আসে। সরকার মাঝে মাঝে উচ্ছেদ অভিযান চালায়—নদীর সীমানায় লাল রঙের খুঁটি পুঁতে দেয়, কিন্তু যে হাত দিয়ে ভাঙে, তার চেয়ে দ্রুত গতিতে অন্য হাত দিয়ে আবার নতুন স্থাপনা তৈরি হয়ে যায়। দখল শুধু নদীর তলদেশে নয়, তার দুই পাড়কেও গ্রাস করেছে।”
উচ্চ আদালতের একাধিক নির্দেশনা এবং দেশের পরিবেশ আইন থাকা সত্ত্বেও, অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে স্থায়ী এবং কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পরিবেশ বিজ্ঞানী ও আইনজ্ঞ ড. জামিল আহমেদ এই বিষয়টিকে ‘রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা’ বলে মনে করেন। তিনি বলেন, “নদী দখলকারীরা কেবল স্থানীয় গুন্ডা বা ভূমিদস্যু নয়। এদের পেছনে বড় বড় রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক শক্তি রয়েছে। উচ্ছেদ অভিযানগুলো প্রায়শই লোকদেখানো হয়, কারণ নদী পুরোপুরি মুক্ত হলে অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির অবৈধ ব্যবসা এবং বাণিজ্যিক স্বার্থ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর ফলে উচ্ছেদ অভিযানে এক ধরনের ঢিলেমি দেখা যায়, যা দখলদারদের আরও উৎসাহিত করে।”
বুড়িগঙ্গার দূষণের মূল কারণ হলো দুটি—অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য এবং শহরের বিশাল পরিমাণের পয়ঃনিষ্কাশন। হাজারীবাগে অবস্থিত ট্যানারিগুলো (যদিও বেশিরভাগই স্থানান্তরিত হয়েছে, পুরোনো রাসায়নিক বর্জ্য এবং অপরিশোধিত নালার জল এখনও নদীর পুরনো অংশে মিশে যায়) এবং আশেপাশের টেক্সটাইল, ডাইং, প্রিন্টিং ও অন্যান্য ক্ষুদ্র কারখানাগুলো প্রতিদিন টন টন অপরিশোধিত, ক্ষতিকর রাসায়নিক বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলে। এই বর্জ্যের মধ্যে থাকে ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম, সিসার মতো ভারী ধাতু, যা শুধুমাত্র জলজ জীবের জন্যই নয়, মানুষের জন্যও মারাত্মক ক্ষতিকর।
সাম্প্রতিক জল পরীক্ষা রিপোর্ট অনুসারে, বুড়িগঙ্গার জলের দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা বেশিরভাগ সময় শূন্যের কাছাকাছি থাকে (০.০ থেকে ০.৫ মিলিগ্রাম/লিটার)। জীবনধারণের জন্য যেখানে প্রতি লিটারে কমপক্ষে ৪-৫ মিলিগ্রাম অক্সিজেন প্রয়োজন, সেখানে এই নদীর জল জৈবিকভাবে মৃত। এর অর্থ হলো—অক্সিজেনের অভাবে নদীর জলে মাছ, পোকামাকড়, এমনকি ছোট অণুজীবও বেঁচে থাকতে পারে না।
বুড়িগঙ্গাকে কেন্দ্র করে একসময় যে মৎস্যজীবী সম্প্রদায় জীবনধারণ করত, তারা আজ কর্মহীন এবং বিপর্যস্ত। কেরানীগঞ্জের বাসিন্দা সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধ মজিদ মিয়া, যিনি সারাজীবন এই নদীতে মাছ ধরেছেন, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, “এই নদীতে এখন শুধু আবর্জনা, পলিথিন আর বিষ ওঠে। একসময় শীতকালে এই নদীতে প্রচুর ইলিশও পাওয়া যেত। এখন জাল ফেললে পলিথিন, ছেঁড়া কাপড় আর জুতোর ঠোকর লাগে। মাছের অস্তিত্ব বিলীন। আমাদের রুজি-রোজগার সব কেড়ে নিয়েছে এই কালো জল। নতুন প্রজন্ম বাধ্য হয়ে অন্য পেশা খুঁজছে।”
নদীর এই বিষাক্ততা কেবল জলজ প্রাণীর ক্ষতি করছে না, নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের মধ্যে চর্মরোগ, শ্বাসকষ্টজনিত রোগ, পেটের রোগ এবং অ্যালার্জির হারও বিপজ্জনকভাবে বাড়িয়ে তুলেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এই তীব্র দূষণ যদি ধীরে ধীরে ভূগর্ভস্থ জলে প্রবেশ করে, যা ঢাকার অনেক এলাকায় এখনও পানীয় জল হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়বে।
বুড়িগঙ্গার এই করুণ দশা একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় পরিবেশকে উপেক্ষা করে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। একটি জীবন্ত পরিবেশকে হত্যা করে যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা হয়, তা আসলে এক বিশাল সামাজিক ও পরিবেশগত ঋণের সৃষ্টি করে। সরকার নদীর নাব্য ফেরাতে, দূষণ রোধে এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে মাঝে মাঝে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কথা বললেও, সেই পরিকল্পনাগুলোর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর, সমন্বয়হীন এবং প্রায়শই প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপে দুর্বল হয়ে পড়ে।
নদীটি আজ আর শুধু একটি জলধারা নয়; এটি আমাদের শাসন ব্যবস্থা, পরিবেশ সচেতনতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের দায়িত্বের প্রতিচ্ছবি। বুড়িগঙ্গার নীরবতা কোনো প্রাকৃতিক নিয়ম নয়, এটি আমাদের নিজেদের ব্যর্থতার আর্তনাদ। এই নিঃশব্দে মরে যাওয়া নদীটি যদি আমাদের বিবেককে জাগাতে না পারে, তবে হয়তো খুব বেশি দেরি হওয়ার আগেই ঢাকার শ্বাস-প্রশ্বাস এবং এর পরিবেশগত ভারসাম্য চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে না পারলে ঢাকা শহরকে বাঁচানো অসম্ভব।