স্বাধীনতা ডেক্স :
পারু আক্তার স্বামী হারিয়েছেন দশ বছর আগে। এতিম সন্তানদের দিয়ে বহু কষ্টে দিন পার করছিলেন। সন্তানদের লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ করলে তার কষ্ট দূর হবে। পূরণ হবে স্বপ্ন। এ আশা নিয়েই সময় পার করছিলেন তিনি। কিন্তু তার স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়েছে। হারিয়েছেন দুই সন্তানকে। নারায়গঞ্জের তল্লাপাড়ার বাসিন্দা তিন ছেলের মা পারু আক্তার বিলাপ করছিলেন।
চিৎকার করে বলছিলেন- আমার ছেলেরা কই, কেউ দেখাবে না? আমি তো আর পারছি না। এই জীবনে আমার আর কিছুই নেই। আমি কী অপরাধ করেছিলাম? উপরওয়ালা আমাকে এমন শাস্তি দিলো। মানুষের বাসায় আরবি পড়িয়ে তিন ছেলেকে স্কুল-কলেজে পড়াচ্ছিলেন পারু। কিন্তু শুক্রবার দুই ছেলেই মসজিদে এসি বিস্ফোরণে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান। আরেক ছেলেও অগ্নিদগ্ধ। পারু আক্তার বিলাপ করতে করতে বলেন, আমার ছেলেগুলো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তো। আমি মানুষের বাড়িতে কোরআন পড়িয়ে যে টাকা পেতাম সেগুলো দিয়ে আমি তাদের মানুষ করেছি। স্কুল-কলেজে পড়িয়েছি। আজ আমার আর কিছুই রইলো না।
শুক্রবার রাতে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা বায়তুস সালাত জামে মসজিদে একসঙ্গে ছয়টি এসি বিস্ফোরণে নিহত ও অগ্নিদগ্ধদের স্বজনদের আহাজারিতে ভারি শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটের বাতাস।
পারু আক্তারকে ছেড়ে বছর দশেক আগে স্বামী চলে গেছেন। এরপর থেকেই সংসারে অভাবের শেষ ছিল না তাদের। তিন সন্তান নিয়ে কোনোরকম দিন কাটছিল পরিবারটির। এরপরেও দমে যাননি পারু আক্তার। মানুষের বাড়িতে আরবি পড়িয়ে তিন ছেলেকে পড়াশোনা করাচ্ছিলেন। স্বপ্ন দেখছিলেন একদিন সন্তানরা মায়ের দিকে তাকাবে, অভাবের ইতি টানবে। সব চলছিল ঠিকঠাক, বড় ছেলে সাব্বির ডিগ্রিতে পড়ছিলেন নারায়ণগঞ্জ ডিগ্রি কলেজে, আর ছোট ছেলে জুবায়ের তুলারাম কলেজে ইন্টামিডিয়েটে এবং সবার ছোট ইয়াসিন পড়ছিল ষষ্ঠ শ্রেণিতে। ঘটনার দিন তিনজনই গিয়েছিলেন বাড়ির পাশেই বায়তুস সালাত জামে মসজিদে। নিয়মিত নামাজ পড়তেন তিন ভাই। পারু আক্তারের আরবির ছাত্রী সাথী আক্তার বলেন, ইয়াসিন পেছনে ছিলেন। সেই প্রথম দৌড়ে পারু আক্তারকে মসজিদে আগুন লাগার খবরটি দেন।
শেখ হাসিনা বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট। পঞ্চম তলা। কান্নার শব্দে ভারি চারপাশ। কাউকে সান্ত্বনা দেয়ার মতো কেউ নেই। শতাধিক মানুষ। কারো না কারো স্বজন পুড়েছে এই ঘটনায়। সেখানে গিয়ে দেখা মিলে বৃদ্ধ করিম মিজিকে। চুপচাপ বসে রয়েছেন। তার কেউ অগ্নিদগ্ধ হয়েছে কি-না জিজ্ঞেস করতেই চোখে পানি ছেড়ে হাঁউমাউ করে কান্না করছিলেন এই বৃদ্ধ। মিনিট পাঁচেক পর কান্না থামিয়ে বল্লেন, ছেলের মৃত্যুর কথা। স্নাতক পাস মোস্তফা কামালের বয়স ৩৪ বছর। বছর খানেক আগে বিয়ে করেছেন। স্ত্রী থাকতেন শ্বশুর বাড়িতেই। বাবাকে কথা দিয়ে এসেছেন, ভালো একটা চাকরি পেলেই স্ত্রী নিয়ে আসবেন বাড়িতে। কিন্তু স্ত্রীকে আর নেয়া হলো না বাড়িতে। তার বাবা করিম বলেন, মোস্তফা সপ্তাহ দুই আগে চাঁদপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ এসেছে। সেখানে টিউশনি করাতো আমার ছেলে। চাকরির জন্য চেষ্টা করছিল। আমার ছেলেটাকে আমি হারালাম। এখন আমি কি নিয়ে বাঁচবো?
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা অনেকেই এসেছেন বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। এর মধ্যে তালহা নামে একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, সবার প্রায় নামাজ পড়া শেষ। আমাদের জামাতও শেষ। অনেকে সুন্নত নামাজগুলো পড়ছিলেন। আবার কেউ কেউ বের হয়ে গেছেন। আমরাও বের হয়ে গিয়েছি। আমরা বের হওয়ার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। আমরা দৌড়ে এসে শুধু পোড়া গন্ধ পাচ্ছিলাম, আর মানুষগুলো দেখছিলাম। তাদের ছটফট, আর্তনাদ দেখে আর সহ্য করতে পারছিলাম না। উদ্ধার করতে নিজেরাই নেমে পড়ি। অনেকের শরীর ধরা সম্ভব হয়নি। শরীরে হাত লাগালেই চামড়া খুলে পড়তো।
আরেক প্রত্যক্ষদর্শী ফয়সাল আসছেন মসজিদের মুয়াজ্জিন দেলোয়ার হোসেনকে দেখতে। তিনিও অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেছেন। ফয়সাল বলেন, মুয়াজ্জিন ও তার ছেলে দুইজনই মারা গেছেন। কুমিল্লার সদর উপজেলার বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন দীর্ঘদিন ধরে এই মসজিদে মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তিনি বলেন, মুয়াজ্জিনের ছেলেও একটি মাদ্রাসায় পড়াশুনা করে। মাদ্রাসা ছুটি তাই বাবার কাছে সে বেড়াতে এসেছে। বেড়াতে এসেই লাশ হয়ে ফিরলো বাবা-ছেলে। এদিকে মসজিদটির ইমামের অবস্থাও সংকটাপন্ন।