শায়খ হাসান মুরাদ :
আজ মঙ্গলবার। ৮ রমযান। জীবন থেকে গত হল ৭টি রোযা। রোযার প্রতিটি মুহূর্ত মর্যাদাপূর্ণ। প্রতিটি নেকিকে আল্লাহ বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বছরের অন্যান্য মাসেও প্রচুর ইবাদত করতেন। তবে রমযান মাসে ইবাদত করতে অন্যান্য মাসের চেয়েও বেশি। নবী পরশে ধন্য সাহাবাগণও রমযান মাসে বে-ইনতেহা ইবাদত করতেন। সুতরাং আমরা তাদের উত্তরসূরী। আমাদের সাধ্যর ভেতরে থেকে বাকি রমযানগুলোর কদর করব ইনশাআল্লাহ!
এখানে রমযানে করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়ে কিছু আলোচনার করা হল।
১.রমযান মাসে রোযা রাখা ফরয। এটা এ মাসের বিশেষ আমল। সকল আদব রক্ষা করে পুরো মাস রোযা রাখা প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য। আমরা নিয়াতকে সুন্দর করে রোযাগুলো আাদায় করব।
২. কুরআন মজীদ তেলাওয়াত : এ মাস কুরআন অবতরণের মাস। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরীল আ.-এর সাথে রমযানের প্রত্যেক রাতে কুরআন মজীদ দাওর করতেন। হাদীস শরীফে এসেছে- ‘হযরত জিবরীল আ. রমযানের শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক রাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে সাক্ষাত করতেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে কুরআন মজীদ শোনাতেন।’-সহীহ বুখারী, হাদীস ১৯০২) বিশষ্টি সাহাবী ইবনে মাসউদ রা. রমযানে প্রতি তিন দিনে এক খতম কুরআন পাঠকরতেন।( ফাযায়েলে কুরাআন -১৮০) হযরত কাতাদা রহ. বছরব্যাপী তাজাজ্জুদ নমাজে প্রতি সাত রাতে কুরআন খতম করতেন। আর রমযান মাসে প্রতি তিন দিনে এক খতম আর শেষে দশকে প্রতি রাতে এক খতন কুরআন পাঠ করতেন। ( লাতায়েফুল মায়ারিফ- ১৭১) হযরত কাসেন নানুতুবি রহ. রমজানে হজের সফরে ছিলন। সাথে কোন হাফেজ ছিল না তাই তিনি প্রতিদিন একপারা কুরআন মুখস্থ করে তারাবি পড়াতেন। এভাবে তিনি হাফেজ হয়েছিলেন। (আকাবির কা রমযান-২৩) অতএব আমাদের প্রত্যেকের উচিত রমযানে অধিক পরিমাণে কুরআন তেলাওয়াত করা। অন্তত একবার হলেও কুরআন মজীদ খতম করা।
৩. দান করা : দান-সদকা সর্বাবস্থাতেই উৎকৃষ্ট আমল, কিন্তু রমযানে তার গুরুত্ব অনেক বেড়ে যায়। হাদীস শরীফে এসেছে- ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়ার সকল মানুষ অপেক্ষা অধিক দানশীল ছিলেন। রমযান মাসে তাঁর দানের হাত আরো প্রসারিত হত।’ -সহীহ বুখারী, হাদীস ১৯০২
৪. তারাবীহ : রমযানের রাতের বিশেষ আমল হল কিয়ামে রমযান তথা বিশ রাকাত তারাবীহ। এ মাসের অফুরন্ত রহমত ও মাগফিরাত লাভ করার জন্য এবং প্রতিশ্রুত ছওয়াব ও পুরস্কার পাওয়ার জন্য তারাবী নামাযের প্রভাব অপরিসীম। অবহেলা-অলসতা না করে প্রতিটি তারাবি আদায় করব। রাসুল সা. বলেন যে ব্যক্তি ইমান ও অধিক সওয়াবের আশায় তারাবির সালাত আদায় করবে, আল্লাহ তার সব গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন। (বুখারি)
৫. নফল ইবাদত : এ মাসে শয়তান শৃংখলাবদ্ধ থাকে। এই সুযোগে অধিক পরিমাণে নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জন করা যায়। এ মাসে যে কোনো ইবাদত নিয়মিত করতে তেমন কোনো বেগ পেতে হয় না এবং পরবর্তীতে তা সহজেই অভ্যাসে পরিণত হয়। সুতরাং যিকির-আযকারের সঙ্গে অধিক পরিমাণে নফল নামায আদায় করা উচিত। অন্তত বিভিন্ন সময়ের নফল নামাযগুলো আদায় করা যেমন-ইশরাক, চাশত ও তাহাজ্জুদ ইত্যাদি।
৬. বেশি বেশি নেক আমল করা : রমজান মাসে অধিক হারে নেক আমলের চেষ্টা করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য একান্ত আবশ্যক, বিশেষ করে রমজানের শেষ দশকে। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘যখন রমজানের শেষ দশক এসে যেত, রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন রাত জাগরণ করতেন, পরিবারবর্গকে নিদ্রা থেকে জাগিয়ে দিতেন, লুঙ্গি শক্ত ও ভালো করে বেঁধে প্রস্তুতি নিতেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ১১৭৪)
৭. ভালো কাজ বেশি বেশি করা: এই মাসে একটি ভালো কাজের বিনিময়ে অনেক নেকি অর্জন করা সম্ভব। কাজেই প্রতিটি মুমিনের উচিত যথাসম্ভব ভালো কাজ করা। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘এই মাসের প্রতি রাতে একজন ঘোষণাকারী এই বলে আহবান করতে থাকে, হে কল্যাণের অনুসন্ধানকারী তুমি আরও অগ্রসর হও। হে অসৎ কাজের পথিক, তুমি অন্যায় পথে চলা বন্ধ করো। তুমি কী জানো? এই মাসের প্রতি রাতে আল্লাহ কত লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন।’ (সুনানে তিরমিজি : ৬৮৪)
৮. দুআ করা : এ মাস রহমত, বরকত, মাগফিরাত ও জান্নাত লাভের মাস। তাই বেশি বেশি আল্লাহ তাআলার শরণাপন্ন হয়ে কান্না-কাটি করে দুআ করা একান্ত কাম্য। দুয়ার জন্য একত্রে সবাই করব এই অপেক্ষা না করা। বরং নিজে নিজে দোয়ার এহতেমাম করা।
৯. মাগফিরাত কামনা করা : যে ব্যক্তি রমযান পেয়েও স্বীয় গুনাহসমূহ ক্ষমা করাতে পারল না তার উপর জিবরীল আ. ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভিসম্পাত করেছেন। তাই জীবনের কৃত গুনাহের কথা স্মরণ করে বেশি বেশি তওবা ইস্তেগফার করা এবং আল্লাহ তাআলার দরবারে ক্ষমা মঞ্জুর করিয়ে নেওয়ার এটিই উত্তম সময়। বিশেষ করে ইফতার ও তাহাজ্জুদের সময় আল্লাহ তাআলার দরবারে ক্ষমা চাওয়া এবং দুআ করা উচিত।
১০. ই’তিকাফ : শেষ দশকের মাসনূন ই’তিকাফ অত্যন্ত ফযীলতের আমল। হাদীস শরীফে এসেছে- ‘নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের শেষ দশদিন ইতিকাফ করতেন।’ -সহীহ বুখারী, হাদীস ২০২১; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১৭১ ঁ
১১. শবে কদর অন্বেষণ : ইবাদত-বন্দেগীর মাধ্যমে রাত্রি জাগরণ করে সহস্র রজনী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ও উত্তম রাত-লাইলাতুল কদর তালাশ করা কর্তব্য। কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে-
১২. সামর্থ্য থাকলে ওমরা পালন করা: হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘এ মাসে একটি ওমরা পালন হজ আদায়ের সমতুল্য।’ (সহিহ বুখারি : ১৮ )
১৩. উত্তম চরিত্র গঠনের অনুশীলন করা: আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার মাস রমজান। এই মাসে নিজেকে এমনভাবে গঠন করতে হবে যাতে বাকি ১১ মাস আল্লাহর ইবাদতে জীবন কাটানো যায়। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ যদি রোজা রাখে, সে যেন অশ্লীল কাজ ও শোরগোল থেকে বিরত থাকে। সিয়াম পালন অবস্থায় কেউ যদি তার সঙ্গে গালাগাল ও মারামারি করতে আসে, সে যেন বলে আমি রোজাদার।’ (সহিহ মুসলিম : ১১৫১)
১৪. ইফতার করা: রমজান মাসে ফজিলতপূর্ণ কয়েকটি আমলের মধ্যে একটি আমল হলো দ্রুত ইফতার করা, বিলম্ব না করা। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি সিয়াম পালন করবে, সে যেন ইফতারের সময় খেজুর দিয়ে ইফতার করে। আর খেজুর না ফেলে যেন পানি দিয়ে ইফতার করে। কেন না পানি হলো- অধিক পবিত্র।’ (সুনানে আবু দাউদ : ২৩৫৭)
১৫. অন্যকে ইফতার করানো: রোজাদারকে ইফতার করানো বিরাট সওয়াবের কাজ। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে তার রোজার সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করবে। কিন্তু তাদের উভয়ের সওয়াব থেকে বিন্দুমাত্রও হ্রাস করা হবে না। (ইবনে মাজা : ১৭৪৬)
১৬. ফিতরা দেওয়া: রোজার ত্রুটি-বিচ্যুতি পূরণার্থে ফিতরা দেওয়া আবশ্যক। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের নামাজের আগে ফিতরা আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। (সহিহ বুখারি : ১৫০৩)
১৭. মিসওয়াক করা: মুখের পবিত্রতা ও মহান রবের সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম মাধ্যম হলো- মিসওয়াক। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোজা রেখেও মিসওয়াক করতেন বলে অনেক বর্ণনায় পাওয়া যায়। (ইবনে খুজাইমা : ১৩৫)
উপরিউক্ত আমল বাদে রমজান মাসে বেশি বেশি নেক কাজ করতে থাকা। যেমন: অন্যকে সাহায্য করা, সুন্দর পরামর্শ দান করা, রোগির সেবা, শ্রমিকদের কর্মে সুযোগ-সুবিধা দেওয়া, ইত্যাদি।
রমযানে বর্জনীয় কাজ:
১.বিবাদ ও বেহায়াপনা থেকে বিরত থাকা : মাহে রমজানে মুমিনকে যাবতীয় ঝগড়া-বিবাদ, মারামারি, অশ্লীল কথা ও বেহায়াপনা থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে। বিশেষ করে অশ্লীল গান-বাজনা এবং রেডিও, টিভি ও মোবাইলের অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকতে হবে। তবেই সিয়ামের সওয়াব ও উচ্চ মর্যাদা লাভ করা যাবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যখন তোমাদের কেউ সিয়াম পালন করবে, তখন সে কোনো মন্দ কথা বলবে না এবং বাজে বকবে না। যদি কেউ তাকে গালি দেয় বা লড়াই করতে আসে তখন সে যেন বলে, আমি ‘সায়েম রোজাদার’। (বুখারি, হাদিস : ১৯০৪)
২.অ্রপ্রয়োজনীয় কথা বার্তা না বলা: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘কত রোজা পালনকারী এমন আছে, (রোজা অবস্থায় অশ্লীল কথা ও কর্ম থেকে বিরত না থাকার ফলে) ক্ষুধা ও পিপাসা ছাড়া রোজা থেকে সে আর কিছু লাভ করতে পারে না। অনুরূপ অনেক রাত জাগরণকারী এমন আছে যে তার রাত্রিজাগরণ থেকে জেগে থাকার কষ্ট ছাড়া আর কিছু পায় না।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৬৯০)
৩. মিথ্যা কথা না বলা: মিথ্যাকে সব পাপের জননী বলা হয়। একটি মিথ্যা থেকে শতশত পাপের সূত্রপাত হয়। তাই আল্লাহ ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিথ্যা কথা থেকে বিরত থাকার আদেশ দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে রোজা রেখেছে অথচ মিথ্যাচার পরিহার করেনি, তার এই কৃত্রিম পানাহার বর্জনের কোনো প্রয়োজন আল্লাহর নেই। (বুখারি: ১৯০৩)
৪.গিবত থেকে বিরত থাকা: গিবত আমল ধ্বংসের নীরব ঘাতক। গিবতের কারণে কখন যে আপনার আমল ধ্বংস হয়ে যাবে তা বুঝতেই পারবেন না। গিবত জিনার চেয়েও জঘন্যতম গুনাহ। তাই গিবত পরিহার উচিত।
৫.রিয়া বা লোক দেখানো ইবাদত করা: রিয়া হলো লোক দেখানো ও আত্মপ্রদর্শনকারী কাজ বা আমল। রিয়া করা শরিয়তে সম্পূর্ণরূপে হারাম। শিরক হলো দুই প্রকার। আর এ রিয়া হলো ছোট শিরক। ফলে রিয়া থেকে অবশ্যই বেঁচে থাকতে হবে।
৬.অপচয় ও অপব্যয় করা: অপচয় কিংবা অপব্যয় করা খুবই বাজে ও গর্হিত অভ্যাস। পবিত্র কোরআনে অপচয়কারীকে শয়তানের ভাই বলা হয়েছে। আল্লাহ তার প্রিয় বান্দাদের পবিত্র কোরআন ও হাদিসের অসংখ্য স্থানে অপচয় করতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে এর মানে এই নয়- অপচয় রোধ করতে গিয়ে কৃপণতা অবলম্বন করবেন। মহান আল্লাহ কৃপণদের পছন্দ করেন না। অপচয় ত্যাগ করার অর্থ হলো মধ্যপন্থা অবলম্বন করা।
মহান রবের কাছ ফরিয়াদ আল্লাহ যেন আমাদের রমযানের করণীয় কাজ বেশি করার এবং বর্জনীয় কাজ বর্জন করার তাওফিক দান করেন।
লেখক:মুহাদ্দিস,লেখক,অনুবাদক